Facebook Twitter Instagram YouTube

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি: ১৮ কোটি মানুষের কাঁধে মূল্যস্ফীতির চাপ


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ১১:১১ পূর্বাহ্ণ /
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি: ১৮ কোটি মানুষের কাঁধে মূল্যস্ফীতির চাপ

দেশের সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম আর বিদ্যুৎ-জ্বালানির দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির চাপে দিশেহারা, ঠিক তখনই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে সরকারি সুবিধাভোগী চাকরিজীবীর সংখ্যা মাত্র ২৪ লাখ। ফলে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর বাইরে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের আয় না বাড়লেও, নতুন পে-স্কেলের প্রভাবে বাজারে যে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে, তার পুরো বোঝা সাধারণ মানুষের কাঁধেই পড়বে। এই অসম বাজার প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম থেকে দশম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। সেই সঙ্গে আনুপাতিক হারে বিভিন্ন ভাতাও বৃদ্ধি পাবে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে এই মূল বেতন কার্যকর করা হবে এবং ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন ভাতা দেওয়া শুরু হবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই নতুন জাতীয় পে-স্কেলের প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়বে এবং নিত্যপণ্যের দামসহ জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।

অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর এ প্রসঙ্গে বলেন, নবম পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সাড়ে ১৪ লাখের বেশি বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য, দারিদ্র্য ও তারল্য সংকটসহ বিভিন্ন আর্থসামাজিক ঝুঁকি বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের যথাযথ পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপে সবাই পিষ্ট। সরকারি কর্মচারীদের এই প্রণোদনা সাময়িক স্বস্তি দিলেও বাকি বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারকে মূল্যস্ফীতি কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে এনে টিসিবির মাধ্যমে আরও বেশি করে ভর্তি মূল্যে পণ্য বিক্রির তাগিদ দেন তিনি।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা না থাকায় অসাধু সিন্ডিকেট পণ্যের দাম বাড়িয়ে ক্রেতাদের নাজেহাল করছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ায় তারা বাড়তি দাম সামাল দিতে পারলেও বেসরকারি ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে রাজধানীর বাজারে মঙ্গলবার ঘুরে দেখা গেছে নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্য। বাজারে এক কেজি সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৮৫-৯০ টাকায়, ব্রয়লার মুরগির কেজি ঠেকেছে ২০০ টাকায়, যা এক মাস আগেও ছিল ১৭০-১৮০ টাকা। এক ডজন ডিম কিনতে লাগছে ১৫০ টাকা এবং চিনির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ টাকায়। এছাড়া মসুর ডাল ১৫০-১৬০ টাকা কেজি, ভোজ্যতেল লিটারে ২০০ টাকা এবং সবজির বাজারেও চলছে চরম অস্থিরতা।

বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. জাহিদুল ইসলাম তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৩৬ হাজার টাকা বেতনে ৫ সদস্যের পরিবার চালাতে গিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে তার কোনো বেতন বাড়েনি, অথচ পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসা খরচ সবই বেড়েছে। কারওয়ার বাজারে আসা আরেক ক্রেতা মো. নোমান জানান, ৪০ হাজার টাকা বেতনে গত ছয় বছরে তার এক টাকাও আয় বাড়েনি। জীবনযাত্রার খরচ মেলাতে খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেওয়ায় তার সন্তানরা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮.৩২ শতাংশ, যা জুনে ছিল ৯.১৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৮.৩২ শতাংশের অর্থ হলো, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যে পণ্য ১০০ টাকায় কেনা যেত, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা কিনতে ১০৮ টাকা ৩২ পয়সা লেগেছে।

বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্যে পুড়ছে দেশের সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে কয়েক দফা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে চাপ আরও বেড়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনসাধারণের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। ফলে অনেকের সংসারে মাস চালানোর বাজেট এখন সপ্তাহেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০-১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। সংগত কারণে প্রশ্ন উঠেছে-তাহলে বেসরকারি চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের বেতন বা আয় বাড়াবে কে। বাস্তবিক অর্থে এ প্রশ্নের উত্তর যখন মিলছে না, তখন ভুক্তভোগীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে ক্ষোভ-হতাশা তৈরি হয়েছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Jugantor