
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দিয়ে “One Teacher One Tab” উদ্যোগ গ্রহণের আলোচনা চলছে। ধারণাটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয় নয় শুধু রোমাঞ্চকও বটে—প্রত্যেক শিক্ষকের হাতে একটি করে ট্যাবলেট কম্পিউটার তুলে দিয়ে ডিজিটাল শিক্ষা বিস্তার! কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলতেই হচ্ছে। এটি কি সত্যিই Value for Money বা সোজা বাংলায় এই বিনিয়োগ সার্থক হবে? অর্থাৎ, এই বিনিয়োগ কি শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফলে ব্যয়িত বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে, নাকি এটি কেবল প্রযুক্তি সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? শিক্ষাবিজ্ঞানের স্বীকৃত সত্য হলো, শিক্ষার গুণগত মান নির্ধারণে প্রযুক্তি কেবল একটি সহায়ক উপকরণ মাত্র; এটি কখনোই শিক্ষকতার দক্ষতার বিকল্প হতে পারে না।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক স্তরের ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫১৮ জন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ২৭ শতাংশের সামান্য বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৭৬ হাজার শিক্ষক কোনো ধরনের পেশাগত প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এর অর্থ হলো, দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষক এখনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছেন। এই বাস্তবতায় কেবল প্রযুক্তি সরবরাহ করলেই শ্রেণিকক্ষে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বর্তমান শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায়ও রয়েছে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষক প্রস্তুতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বাস্তব বিদ্যালয়ে দীর্ঘমেয়াদি শ্রেণিকক্ষ অনুশীলন (School-based Practicum), যেখানে প্রশিক্ষণার্থী বাস্তব শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঠদান করেন, অভিজ্ঞ মেন্টরের পর্যবেক্ষণ পান এবং নিয়মিত পুনর্নিবেশ (feedback) গ্রহণ করে নিজের দক্ষতা উন্নয়ন করেন। অথচ বাংলাদেশে বিএডসহ অধিকাংশ প্রশিক্ষণ এখনো প্রথাগত বক্তৃতাভিত্তিক পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এছাড়া প্রশিক্ষণ পরবর্তী ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের (Continuous Professional Development—CPD) কোনো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকায় অনেক শিক্ষকই পুরনো অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।
একজন দক্ষ শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই পড়ে শোনান না, বরং প্রশ্নভিত্তিক আলোচনা ও অনুসন্ধানমূলক শিক্ষণের মাধ্যমে পাঠকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। এখানেই “One Teacher One Tab” উদ্যোগের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। যদি শিক্ষক জানেন না কীভাবে ডিজিটাল কনটেন্ট নির্বাচন করতে হয়, কীভাবে প্রযুক্তিকে পাঠপরিকল্পনার সঙ্গে একীভূত করতে হয়, কীভাবে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে ট্যাবটি বাস্তবে কী কাজে ব্যবহৃত হবে? অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত ডিভাইসে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। প্রযুক্তি তখন শিক্ষার পরিবর্তনের মাধ্যম না হয়ে কেবল একটি সরকারি সম্পদে পরিণত হয়। তাই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের চেয়ে শিক্ষকের বিষয়জ্ঞান, যোগাযোগ দক্ষতা ও শিক্ষণ নেতৃত্বের মতো সক্ষমতায় বিনিয়োগ করা জরুরি।
শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতির অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মেধাবীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করতে হলে প্রশাসনিক ও পেশাগত সংস্কার প্রয়োজন। ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব উদ্যোগ সফল করতে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য মানসম্মত প্রাক-সেবা ও কর্মরত অবস্থায় পেশাগত প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ভিত্তিক মেন্টরিং, নিয়মিত ফিডব্যাক ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল পেডাগজির ওপর জোর দিতে হবে। প্রযুক্তি কখনোই শিক্ষকের বিকল্প নয়, বরং প্রশিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত শিক্ষকের হাতে এটি একটি শক্তিশালী উপকরণ হতে পারে। অন্যথায়, এই উদ্যোগ কেবল একটি ব্যয়বহুল প্রকল্পে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
আপনার মতামত লিখুন :