
বিশ্ব অর্থনীতির আকার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও স্ট্যাটিস্টার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের মোট জিডিপির আকার প্রায় ১২৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ক্রয়ক্ষমতার সমতা (পিপিপি) বিবেচনায় এই পরিমাণ প্রায় ২১৯ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে বিস্ময়করভাবে, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির শীর্ষ ১৫টি দেশের তালিকায় এখনো কোনো মুসলিমপ্রধান দেশের স্থান হয়নি।
আইএমএফের সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতির তালিকায় মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে তুরস্ক সবার উপরে রয়েছে, যা ১৬তম স্থানে অবস্থিত। এরপর ১৭তম স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া এবং ১৯তম স্থানে রয়েছে সৌদি আরব। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক জিডিপি ১২৫ থেকে ১২৬ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সাময়িক মন্দাভাব থাকলেও ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট জিডিপি চারগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
১৯৬০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। গত ৬৬ বছরে শীর্ষ ২০ অর্থনীতির তালিকায় অনেক দেশের পরিবর্তন ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থান অটুট রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির আকার ৩২ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের ২০ দশমিক ৮৫ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি। শীর্ষ ২০ অর্থনীতির তালিকায় থাকা অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স, ইতালি, রাশিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সুইজারল্যান্ড।
তালিকায় ১৬তম স্থানে থাকা তুরস্কের জিডিপি ১ দশমিক ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলার, ১৭তম স্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ার জিডিপি ১ দশমিক ৫৪ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ১৯তম স্থানে থাকা সৌদি আরবের জিডিপি ১ দশমিক ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এই তিন দেশের সম্মিলিত জিডিপি ৪ দশমিক ৫৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা একাই তৃতীয় স্থানে থাকা জার্মানির ৫ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির চেয়ে কম।
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও স্ট্যাটিস্টাসহ বিভিন্ন সংস্থার মতে, শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর বিশাল জিডিপির পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, ভৌগোলিক সুবিধা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি। মূলত এই দেশগুলো বৈশ্বিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ এবং অ্যাপল, মাইক্রোসফট, টয়োটা ও স্যামসাংয়ের মতো বহুজাতিক ব্র্যান্ড তাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে, মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর জিডিপি পিছিয়ে থাকার পেছনে ডলারের বিনিময়হারের প্রভাব, কাঁচামাল ও প্রাথমিক পণ্যের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এবং উচ্চ প্রযুক্তি শিল্পে অনগ্রসরতা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদাত হোসাইন সিদ্দিকী জানান, কোনো দেশের জিডিপি কোথা থেকে আসছে, তা-ই সক্ষমতার মূল নির্ধারক। তার মতে, গরিব দেশগুলোতে অব্যবহৃত মানবসম্পদ পূর্ণ কর্মসংস্থানে আনতে পারলে জিডিপি দ্রুত বাড়তে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, উন্নত দেশগুলো উদ্ভাবন ও নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে আধিপত্য বিস্তার করছে, যেখানে মুসলিম দেশগুলো এখনো মূলত কাঁচামাল সরবরাহ বা পণ্য সংযোজনের স্তরে সীমাবদ্ধ রয়েছে। নেদারল্যান্ডসের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, উন্নত প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে ছোট দেশও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি এখনো অনেকাংশে কয়লা, পাম অয়েল ও খনিজসম্পদের মতো প্রাথমিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চ প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকায় মূল্য সংযোজন কম হয়। সৌদি আরবের অর্থনীতি মূলত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে গেলে কিংবা উৎপাদন সীমিত হলে দেশটির অর্থনীতিও সরাসরি প্রভাবিত হয়। যদিও ভিশন-২০৩০ কর্মসূচির আওতায় দেশটি অ-তেল খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
আপনার মতামত লিখুন :